Top News

আমি গুণ ও কর্ম্মের বিভাগ দ্বারা চাতুর্ব্বর্ণ্য সৃষ্টি করিয়াছি

 'ব্রহ্ম জানাতি ইতি ব্রাহ্মণঃ', 

ওঁ শ্রী পরমাত্মনে নমঃ 

নমঃ ভগবতে বাসুদেবায়ঃ 

ভগবান বলিলেন -- >>>

ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্রগণের কৰ্ম্ম সকল পূর্ব্ব জন্মের সংস্কার-জাত গুণদ্বারা বিশেষরূপে বিভক্ত।।  (১৮/৪১ শ্লোক) 

আমি গুণ ও কর্ম্মের বিভাগ দ্বারা চাতুর্ব্বর্ণ্য সৃষ্টি করিয়াছি [সত্য কিন্তু ] তাহার কর্তা হইলেও বস্তুতঃ আমায় অব্যয় এবং [ আসক্তি-শূন্যতাবশতঃ ] অকর্তা জানিও।।  (৪/১৩ শ্লোক) 

গুণ সকল আমাতে আছে, কিন্তু আমি তাহাতে নাই"।।   (৭/১২ শ্লোক) 
মূলাধার হইতে আজ্ঞাচক্র পর্য্যন্ত গুণের স্থান, তদূদ্ধে গুণাতীত স্থান। 

পূর্ব্ব-জন্মসংস্কার-গুণে যিনি যেমন গুণের ব্যক্তি, তিনি সেইরূপ কৰ্ম্মে বিভক্ত হন অর্থাৎ যিনি যে গুণ-প্রধান, তিনি সেই শ্রেণীর কার্য্যে বিভক্ত হন (৪র্থ অঃ ১৩শ শ্লোকের মর্ম্ম দ্রষ্টব্য); অতএব গুণানুসারেই বর্ণের সৃষ্টি; সত্ত্ব-প্রধান যিনি, তিনি ব্রাহ্মণ; সত্ত্বরজঃ-প্রধান ক্ষত্রিয়; রজস্তমঃ-প্রধান বৈশ্য, তমঃ-প্রধান শূদ্র; যিনি যে যে গুণে প্রধান থাকেন তিনি সেই সেই শ্রেণী পদবাচ্য অবস্থা প্রাপ্ত হন। যখন গুণানুসারে বর্ণের সৃষ্টি তখন সদ্গুরূপদিষ্ট মার্গে ক্রমশঃ উন্নতি লাভ করিয়া সকলেই ব্রাহ্মণত্ব লাভ করিতে পারেন (৯ম অঃ ৩০শ শ্লোক দ্রষ্টব্য); সুতরাং ব্রাহ্মণত্ব লা করা গুণগত, বংশগত নহে; যদি কেহ ব্রাহ্মণ বংশে জন্মিয়া বর্ণোচিত কার্য্যন  করে, তাহা হইলে সেই ব্যক্তিকে ব্রাহ্মণ-বংশজাত মাত্র বলা যায়, ব্রাহ্মণ বলা যায় না; কারণ, 'ব্রহ্ম জানাতি ইতি ব্রাহ্মণঃ', যতক্ষণ সেই ব্রহ্মজ্ঞানলাভরূপ অবস্থা না হয়, ততক্ষণ [ব্রাহ্মণ-কুলে জন্মিলেও] প্রকৃত ব্রাহ্মণ কেহই নহেন; কিন্তু যদি কেহ অতি নীচবংশে জন্মিয়াও ক্রমশঃ উন্নতি-মার্গে প্রথমে তমঃ, পরে তমোরজঃ ও তৎপরে রজঃসত্ত্ব অতিক্রম করিয়া কেবল সত্ত্বগুণে অবস্থান করিতে পারে, তখন সেই নীচ-বংশজাত ব্যক্তিও ব্রাহ্মণত্ব প্রাপ্ত হয়; যেমত বাল্মীকি, দস্যু রত্নাকর অবস্থা হইতে বাল্মীকির মুনি-পদবাচ্য অবস্থা ও বিশ্বামিত্রের ক্ষত্রিয় কুমার হইতে ব্রাহ্মণত্ব পদলাভরূপ অবস্থা। অতএব ব্রাহ্মণত্ব লাভ, বিনা সাধনে হইবার নহে। কেবল ব্রাহ্মণ-বংশে জন্মিলেই ব্রাহ্মণত্ব লাভ হয় না, তাহা হইলে পণ্ডিতের পুত্রও পড়াশুনা না করিয়াই পণ্ডিত হইতে পারিত। তবে বিশুদ্ধ ব্রাহ্মণ-বংশে জন্ম গ্রহণ অতি সুকৃতি-সাপেক্ষ; কারণ ব্রাহ্মণ-পুত্রের সৎপথ ও সদ্গুরু লাভ অতি সহজে (ঘরে বসিয়াই) হয়; এই জন্যই ব্রাহ্মণ-বংশের এত গৌরব এবং ব্রাহ্মণ-বংশই সমাজের নেতা ।। (১৮/৪১ শ্লোক) 
সত্ত্ব, রজঃ এবং তমঃ এই তিনগুণ প্রাণ হইতেই উৎপন্ন; মূলাধার হইতে নাভির নীচে পর্যন্ত তমোগুণের স্থান; নাভি হইতে কণ্ঠের নীচে পর্যন্ত রজোগুণের স্থান; এবং কণ্ঠ হইতে আজ্ঞাচক্র পর্যন্ত সত্ত্বগুণের স্থান; প্রাণের চঞ্চলাবস্থারূপ মন, যখন যে গুণের স্থানে থাকে, তখন জীবের তদনুযায়ী ভাব হয়; মন যখন সত্ত্ব গুণের স্থানে থাকে, তখন সাত্ত্বিক ভাবাপন্ন হয়; যখন রজস্তমো গুণের স্থানে থাকে, তখন রাজসিক ও তামসিক ভাবাপন্ন হয় এবং উক্ত ভাবানুযায়ী শম, দম, হর্য, দর্প, শোক, মোহ ইত্যাদি উৎপন্ন হইয়া থাকে অর্থাৎ মন যখন তামসিক ভাবাপন্ন থাকে, তখন শোকমোহাদির জ্বালা ভোগ করে; যখন রজোগুণের স্থানে রাজসিকভাবে থাকে, তখন হর্ষ ও দপাদিতে অভিভূত থাকে এবং যখন সত্ত্বগুণের স্থানে থাকে, তখন শম (অন্তঃকরণের স্থিরতা); দম (দমন করা-ইন্দ্রিয় সংযম শক্তি) ইত্যাদি সাত্ত্বিকভাবে থাকে; আর যখন সত্ত্বগুণেরও ঊর্দ্ধ স্থানরূপ গুণাতীত স্থানে মন থাকে তখন মনের লয়, অর্থাৎ ভাবাতীত অবস্থা; সে অবস্থায় আর সত্ত্বাদি কোন ভাবই থাকে না; কিন্তু জীবের সে অবস্থা হয় কই? জীব সর্ব্বদা ত্রিগুণে জড়িত হইয়া আছে এবং ইহার ফলানুযায়ী সুখদুঃখাদি সতত ভোগ করিতেছে; জীব যখন তিন গুণকে অতিক্রম করিয়া গুণাতীত স্থানে অবস্থিতি করিবে, তখনই উক্ত ভাবাতীত অবস্থা প্রাপ্ত হইবে; তিনগুণের উৎপত্তি, চঞ্চল প্রাণ হইতে, যাহার প্রাণবায়ু আজ্ঞাচক্র হইতে নাভি পর্যন্ত যাতায়াত করিতেছে (অর্থাৎ নাভিতে গিয়াই স্থির হইতেছে; তন্নিম্নে আর যাইতেছে না) সে তমোগুণকে অতিক্রম করিয়াছে, ঐরূপ যাহার আজ্ঞাচক্র হইতে কণ্ঠ পর্য্যন্ত যাতায়াত হইতেছে (অর্থাৎ কণ্ঠে গিয়াই প্রাণবায়ু স্থির হইতেছে) সে রজস্তমো অতিক্রম করিয়া কেবলমাত্র সত্ত্বগুণে রহিয়াছে, আর যাহার প্রাণবায়ু আজ্ঞাচক্রের নীচে কণ্ঠেও নামিতেছে না অর্থাৎ আজ্ঞাচক্রের উর্দ্ধে গিয়া স্থিতি প্রাপ্ত হইয়া রহিয়াছে, সেই ব্যক্তিই তিনগুণকে অতিক্রম করিয়াছেন, তাঁহারই ভাবাতীত অবস্থা; উপরিউক্ত তিনগুণ, প্রাণরূপী আত্মা হইতেই, অর্থাৎ উহা তাঁহারই গুণ, তাঁহার ঐ সকল গুণাদি রহিয়াছে, কিন্তু তিনি উহাতে লিপ্ত নহেন; যেহেতু তিনি গুণাতীত নিরঞ্জন ব্রহ্ম তিনি স্থিরব্রহ্মরূপে গুণাতীত বিজ্ঞান-পদরূপ ঊর্দ্ধস্থানে অবস্থিত রহিয়াছেন; গুণের কার্য্য সকল তাঁহার চঞ্চলা প্রকৃতি কর্তৃকই সাধিত হইতেছে; একারণ বলিতেছেন "গুণ সকল আমাতে আছে, কিন্তু আমি তাহাতে নাই"।। (৭/১২ শ্লোক) 

অব্রাহ্মণ হলে তাঁর থেকে কি ক্রিয়াযোগ দীক্ষা নেওয়া যেতে পারে?                                                                                                                                                                                                                                                                                          সনাতন ধর্মীয়  গ্রন্থ গীতা থেকে জানা যায় যে ব্রাহ্মণ্যত্ব একটা অবস্থা মাত্র। যে কোনো মানুষ তার বংশ কৌলিন্য যাই থাক না কেন গুরুপদিষ্ঠ ক্রিয়াযোগ সাধনের মাধ্যমে স্ত্রী পুরুষ নির্বিশেষে ব্রাহ্মণত্ব পর্যায়ে উন্নীত হতে পারেন। এই ব্রাহ্মণত্ব লাভ বংশগত নহে গুণগত। কেহ যদি ব্রাহ্মণ বংশে জন্মগ্রহণ করেও ব্রহ্মত্ত লাভ না হয় তাহলে তাকে ব্রাহ্মণ কুলে জাত  এইটুকু বলা যায় মাত্র, ব্রাহ্মণ বলা যায় না। কারণ "ব্রহ্ম জানাতি ইতি ব্রাহ্মণ:"।
আবার নীচবংশে জন্মগ্রহণ করে সুসংস্কার সম্পন্ন যে কোন ব্যক্তি কঠোর সাধনা বলে ক্রমশ উন্নতি মার্গে প্রথমে তম: পরে তমোরজ: ও তৎপরে রজ:সত্য অতিক্রম করিয়া কেবল সক্ত গুনে অবস্থান করিতে পারে তখন সেই নিচু বংশজাত ব্যক্তি ও ব্রাহ্মণ্যত প্রাপ্ত হয়। যেমন বাল্মিকী ,দস্যু রত্নাকর অবস্থা থেকে বাল্মিকী মুনি পদবাচ্য হন , বিশ্বমিত্রের ক্ষত্রিয় কুমার হতে ব্রাহ্মণত্ব পদ লাভ রূপ অবস্থা। যদি ব্রাহ্মণ বংশে জন্মালেই ব্রাহ্মণ হওয়া যেত তাহলে পন্ডিতের পুত্র পড়াশোনা না করে পন্ডিত হতে পারত। অনেক সময় শাস্ত্রের ভুল ব্যাখ্যা করা হয়। জন্মাবার সাথে সাথে সবাই ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করতে পারে না। সাধনা করে  ব্রহ্মগ্য হতে হয়।  সুতরাং ব্রাহ্মণ্যত্ব কর্ম ও গুণগত, জন্মগত নহে। যে ব্যক্তি এই ব্রাহ্মণ্যত্ব লাভ করেছেন তার থেকেই একমাত্র দীক্ষা নেওয়া উচিত।
-------------------------------------------------------------  Read More

Post a Comment

Previous Post Next Post