'রথে তু বামনং দৃষ্টা পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে'
ওঁ কাররূপ রথ ও বৃহৎ কূটস্থ বর্ণনা
ওঁ কার রূপ রথ ও বৃহৎ কূটস্থ বর্ণনা (পঞ্চানন ভট্টাচার্য, জগৎ ও আমি)
------------------------------ --------------------
"ওঁকার রথমারুহাবিষ্ণুং কৃত্বা তু সারথিম্। ব্রহ্মলোক পদাম্বেষী, রূদ্রোরা ধনতৎপরঃ ।।"
অর্থাৎ মানব শরীর মাত্রকেই ওঁকার রূপ রথ কহা যায়। রথ শব্দের অর্থ শরীর। "আত্মানং রথিনং বিদ্ধি শরীরং রথ মেবচ"।
প্রাণরূপ আত্মাই এই শরীর রূপ রথের রথী, বর্তমানে মনই এই মানব শরীর রূপ রথে আরূঢ় হইয়া রথস্থ যোদ্ধারূপে অবস্থিত রহিয়াছে, মনকে ও আত্মা কহা যায়। বর্তমান ওঁকার রূপ মানব শরীর চক্রযুক্ত যুদ্ধযান। ওঁকারকে মানব শরীর বলা হয় কেন তাহাও জানা আবশ্যক। ওম্ শব্দ না লিখিয়া লিখনে ওঁ শব্দ প্রচলিত হইয়াছে। ওম্ শব্দই ওঁকার পদবাচ্য। ওঁকার শব্দের অর্থ -ওম্ = সম্মতি সূচক শব্দ, কার= যে করে, অর্থাৎ যে আমাদের ইচ্ছানুযায়ী কর্ম করে। মানব শরীর জীবের ইচ্ছানুযায়ী কর্ম করিয়া থাকে অর্থাৎ মানব শরীরের দ্বারা এবং শরীরস্থ কর্মেন্দ্রিয়ের দ্বারা যে সকল কার্য হইয়া থাকে, তৎসমুদায় কর্মই জীবের ইচ্ছানুযায়ী হইয়া থাকে বলিয়া শরীরকে ওঁকার কহা যায়। জীব শরীরে সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ-এই তিন গুণ ও রহিয়াছে, সত্ত্বগুণ বিষ্ণুকে কহা যায়, রজঃগুণ ব্রহ্মাকে কহা যায়, তমঃগুণ শিবকে কহা যায়, "এয়োদেবীস্ত্রয়োগুণাঃ”- এই তিনগুণ ত্রিবর্ণাত্মক। অ, উ, ম; অ সত্ত্বগুণ-বিষ্ণু, উ রজঃগুণ-ব্রহ্মা, ম তমঃগুণ-শিব-ইঁহারা বায়ুরূপী দেবতা ঈড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্নারূপী নাড়ীত্রয়ে বায়ুরূপে রহিয়াছেন। ওই ত্রিগুণের সাম্য অবস্থায় আত্ম সংযম হইলে অর্থাৎ শ্বাস-প্রশ্বাসের চঞ্চলতারূপ দর্প বল চূর্ণ হইলে, তখন স্থির প্রাণরূপ ঈশ্বরের বাচক ওম্ এই ধ্বনি স্বতঃ হৃদয়াকাশে শ্রুতি গোচর হইয়া থাকে, ইহাকে ওঁ কার ধ্বনি কহে। অ, উ, ম, সত্ত্ব রজঃ তমঃ এই তিনগুণের মিলনরূপ সন্ধিদ্বারা আত্মসমীপে মনের মিলন হইলে তখন হৃদয়াকাশে স্থিরপ্রাণরূপ আত্মা হইতে ওম্ এই সম্মতি সূচক স্বস্তি বাক্য প্রকাশ হইয়া থাকে। স্বস্তি অর্থাৎ শুভ হউক ইহার সঙ্কেতরূপ ওম্ ধ্বনি তখন স্বতঃ ধ্বনিত হইতে থাকে। ইকাকেই ওঁকার ধ্বনি বা অন্যহত ধ্বনি কহা যায়। ইহা নিজ বোধরূপ অবস্থা। প্রাণায়ামরূপ শরক্রিয়ার অতীতাবস্থায় ইহা প্রকাশ পাইয়া থাকে। ইহা অতি গূঢ় বিষয়, সাধন দ্বারা লব্ধ। নচেৎ মুখে ওম্ ওম্ শব্দ লক্ষ লক্ষ বার বলিলেও ইহার রহস্য ভেদ হইবার নহে।
যাঁহারা ব্রহ্মজ্ঞান লাভের বা পরমাত্ম জ্ঞান লাভের প্রকৃত পথ অন্বেষণ করিতে ইচ্ছুক, তাঁহাদিগকে সত্ত্বগুণ-বিষ্ণুকে (সত্ত্বগুণ এবং বিষ্ণু সম্বন্ধে পূর্বে বলা হইয়াছে, এখানে পুনরুল্লেখ অনাবশ্যক) পূর্বোক্তভাবে মনের সারথি করতঃ মনকে চক্রপথে চালিত করিয়া রুদ্রের সাধনে তৎপর হইতে হইবে অর্থাৎ রুদ্র শব্দের অর্থ প্রাণ (যে রুদ্রান্তে খলু প্রাণাঃ ইত্যাদি), সেইরূদ্র স্বরূপ নিজ প্রাণের আরাধনায় রত থাকিয়া, গুণাতীত অবস্থার অর্থাৎ বর্তমান প্রাণকর্মের অতীতাবস্থারূপ স্থিরপ্রাণ আত্মার তেজোময় কূটস্থ মণ্ডল (ভ্রূ মধ্যে বিরাজমান)
পৌরাণিক মতে, 'রথে তু বামনং দৃষ্টা পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে' অর্থাৎ আমাদের দেহ ও শরীররূপ রথে আত্মারূপ বামন মানে পরমব্রহ্ম শ্রীভগবানকে দর্শন করতে পারলে দুঃখ-সুখ, রোগ-ব্যাধি, কাম-কীট পূর্ণ এ শরীর আর পুনরায় ধারণ করতে হয় না। এই সংসাররূপ পৃথিবীতে আর গমনাগমন করতে হয় না। এ পুণ্য তিথীতে স্নানদানে সহস্রগুণফললাভ হয়ে থাকে।
কঠোপনিষদে বলা হয়েছে,
""আত্মানম্ রথিনম্ বিদ্ধি শরীরম্ রথমেব তু।
বুদ্ধিম্ তু সারথিম্ বিদ্ধি মনঃ প্রগ্রহমেবচ॥"
"ইন্দ্রিয়ানি হয়ানাহুর্বিষয়াম্স্তেষু গোচরান।
আত্মেন্দ্রিয়মনোয়োক্তম্ ভোক্তেত্যাহুর্মনীষিনঃ॥""
কঠোপনিষদ ১/৩/৩-৪
অর্থাৎ, আমাদের প্রত্যেকের শরীর হল রথ, আর বামন জগন্নাথ (আত্মা ও পরমাত্মা) হল সেই রথের স্বামী, আমাদের মন হল লাগাম, ঘোড়াগুলি হল ইন্দ্রিয়, এবং মনীষীগণ(যোগীপুরুষ-আমরা) বুদ্ধিরুপী সারথির নিয়ন্ত্রনে মন ও ইন্দ্রিয়কে বশীভূত করে (বিষয়রুপী) জীবন পথে পরিচালনা করে পরমাত্মামুখী যাত্রা(শুদ্ধজ্ঞানের দ্বারা কর্ম) করে উনার আশ্রয় লাভ করে(ঈশ্বরপ্রাপ্তি)।
উপনিষদের এই শ্রুতি যেন আমাদের মহাভারতের অজেয় যোদ্ধা ও তাহার পথপ্রদর্শকের সেই রথের দৃশ্যপট তুলে ধরে। যেখানে যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই ইন্দ্রিয় স্বরুপ অদম্য অশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং রথী অর্জুন তার লক্ষ্য এগিয়ে চলছে। সে দর্শন যেন পুনঃ দৃশ্যমান হয়েছিলো কুরুক্ষেত্রের প্রান্তরে।
আমরা অনেক উপমা ও এমন উপাখ্যান এর তাৎপর্য উপলব্ধি করি না। এই দেহ রথ, আমি জীবাত্মা ও সর্বশক্তিমান পরমাত্মা এই রথের রথী। পরমাত্মার নিকট এই ইন্দ্রিয়ের লাগাম সমর্পণ করে, আমি জীবাত্মা এই দেহরথকে পরিচালিত করবো মোক্ষ অর্জনের পথে। ইহাই রথযাত্রা, ইহাই রথযাত্রার দার্শনিক চিন্তা।
রথযাত্রার ইতিহাস —
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর অনেকদিন কেটে গেছে। শ্রীকৃষ্ণ তখন দ্বারকায়। শ্রীকৃষ্ণের জ্যেষ্ঠভ্রাতা বলরাম যোগবলে দেহত্যাগ করার পর শ্রীকৃষ্ণ এক বনে গিয়ে ধ্যান শুরু করেন।
একদিন তিনি গাছের উপর পা ঝুলিয়ে বসে ছিলেন। তাঁর রাঙা চরণকে টিয়া পাখি ভেবে ভুল করে তীর নিক্ষেপ করে বসল এক শবর। নাম তার জরা। বাম পায়ে তীরের আঘাতেই অবশেষে জীবনাবসান হল শ্রীকৃষ্ণের !
অপঘাতে শ্রীকৃষ্ণের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে অর্জুন ছুটে এলেন দ্বারকায়। দেহ সৎকারের সময় অর্জুন দেখলেন, গোটা দেহটা পুড়লেও সখার নাভিদেশ তো পুড়ছে না !
তখনই হল দৈববাণী, ‘ইনিই সেই পরমব্রহ্ম। অর্জুন, এঁকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করো। সমুদ্রেই ওঁর অনন্তশয়ন।’ অর্জুন তাই করলেন। ঢেউয়ের মাথায় ভাসতে ভাসতে এগিয়ে চলল পরমব্রহ্ম সেই নাভি। আর তাকে লক্ষ করে সমুদ্রের তীর ধরে ছুটে চলল অনার্য সেই শবর – জরা। শেষ অবধি তার তীরের আঘাতেই মৃত্যু হল ভগবানের !
দ্বারকা থেকে পুরী পর্যন্ত ছুটে চলা। অবশেষে এখানেই ভগবানের স্বপ্নাদেশ পেল সে, ‘কাল ভোরে আমাকে তুলে নে, এখন থেকে তোর বংশধর, শবরদের হাতেই পুজো নেব আমি’। তখন থেকে নীলমাধবরূপে তিনি পূজিত হতে থাকলেন শবরদের কাছে। সময়টা দ্বাপর যুগ।
এরপর এলো কলি যুগ। শাস্ত্র মতে শ্রীকৃষ্ণের পরলোকগমনের মধ্যে দিয়েই ৩১০১ খ্রিস্টপূর্বের ১৮ই ফেব্রুয়ারি মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের পূর্ণিমা তিথিতে শুক্রবারে দ্বাপর যুগের সমাপ্তি ঘটে ও কলি যুগের সূচনা হয়।
কলি যুগে কলিঙ্গের রাজা তখন ইন্দ্রদ্যুম্ন দেব। তিনি ছিলেন বিষ্ণুর ভক্ত। সেই উদ্দেশ্যে তিনি গড়ে তুললেন একটি মন্দির, শ্রীক্ষেত্রে। এখন আমরা তাকে চিনি জগন্নাথধাম রূপে। কিন্তু মন্দিরে বিগ্রহ নেই।
রাজসভায় একদিন কথা প্রসঙ্গে তিনি জানতে পারলেন নীলমাধবের কথা। ইনি নাকি বিষ্ণুরই এক রূপ। অমনি চারদিকে লোক পাঠালেন রাজা। এঁদের প্রত্যেকেই ধার্মিক ব্রাহ্মণতনয়। বাকিরা খালি হাতে ফিরে এলেও, ফিরলেন না একজন – বিদ্যাপতি। তিনি জঙ্গলের মধ্যে পথ হারালে তাঁকে উদ্ধার করলেন সুন্দরী শবর কন্যা ললিতা। নিয়ে এলেন তাদের বাড়ি।
ললিতা শবররাজ বিশ্ববসুর কন্যা। ললিতার প্রেমে পড়লেন বিদ্যাপতি। বিয়ে হল দুজনের। বিয়ের পর বিদ্যাপতি আবিষ্কার করলেন রোজ সকালেই শবররাজ কয়েক ঘণ্টার জন্য কোথাও উধাও হয়ে যান, আবার ফিরে আসেন। কোথায় যান বিশ্ববসু ! স্ত্রীকে প্রশ্ন করতে বিদ্যাপতি জানতে পারলেন জঙ্গলের মধ্যে একটি গোপন জায়গায় নীলমাধবের পূজো করতে যান শবররাজ বিশ্ববসু।
নীলমাধবের সন্ধান যখন পাওয়া গেছে, তখন আর ছাড়ার নয়। অমনি বিদ্যাপতি বায়না ধরলেন, তিনিও দর্শন করবেন নীলমাধবকে। বিশ্ববসু প্রথমে রাজি না হলেও, অবশেষে মত দিলেন। তবে শর্তসাপেক্ষে। বিগ্রহ পর্যন্ত চোখ বেঁধে যেতে হবে বিদ্যাপতিকে। জামাতা হলেও বিদ্যাপতিকে কোন ভাবে নীলমাধবের সন্ধান দিতে রাজি ছিলেন না বিশ্ববসু।
বিদ্যাপতিও ছাড়ার পাত্র নন। চোখ বাঁধা অবস্থায় যাওয়ার সময় তিনি গোটা পথটায় সরষের দানা ছড়াতে ছড়াতে গেলেন। যথাস্থানে পৌঁছে যখন তিনি দর্শন পেলেন নীলমাধবের, তখন তাঁর প্রাণ আনন্দে ভরে উঠল।
বনের মধ্যে পূজোর ফুল কুড়িয়ে এনে বিশ্ববসু যখন পূজোয় বসলেন, অমনি দৈববাণী হল, ‘এতদিন আমি দীন-দুঃখীর পূজো নিয়েছি, এবার আমি মহাউপাচারে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের পূজো নিতে চাই।’
ভীষণ রেগে গেলেন শবররাজ। ইষ্টদেবতাকে হারাবার দুঃখে বন্দী করলেন বিদ্যাপতিকে। কিন্তু কন্যা ললিতার বারবার কাকুতি মিনতিতে বাধ্য হলেন জামাতাকে মুক্ত করতে। বিদ্যাপতিও সঙ্গে সঙ্গে এই খবর পৌঁছে দিলেন রাজার কাছে। ইন্দ্রদ্যুম্ন মহানন্দে জঙ্গলের মধ্যে সেই গুহার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন ভগবানকে সাড়ম্বরে রাজপ্রাসাদে আনতে। কিন্তু একি, নীলমাধব কোথায় ! আটক হলেন শবররাজ।
তখন দৈববাণী হল যে, 'পুরীর সমুদ্রতটে ভেসে আসা একটি কাষ্ঠখণ্ড দিয়ে তার মূর্তি নির্মাণ করার।'
হাজার হাজার হাতি, ঘোড়া, সেপাইসাস্ত্রী, লোকলস্কর নিয়েও সমুদ্র থেকে তোলা গেল না সেই কাঠ। শেষে কাঠের একদিক ধরলেন শবররাজ আর একদিক ব্রাহ্মণপুত্র বিদ্যাপতি। জগন্নাথের কাছে ব্রাহ্মণ-শবর কোনও ভেদাভেদ নেই যে !
রাজা তাঁর কারিগরদের লাগালেন মূর্তি গড়তে। কিন্তু সেই কাঠ এমনই পাথরের মত শক্ত যে ছেনি, হাতুড়ি সবই যায় ভেঙে। মূর্তি নির্মাণের জন্য রাজা, একজন উপযুক্ত কাষ্ঠশিল্পীর সন্ধান করতে থাকেন। তখন এক রহস্যময় বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ কাষ্ঠশিল্পী পরিচয়ে, তাঁর সম্মুখে উপস্থিত হন এবং মূর্তি নির্মাণের জন্য একুশদিন সময় চেয়ে নেন। সেই কাষ্ঠশিল্পী রাজাকে একটি শর্ত দেন, মূর্তি নির্মাণকালে কেউ যেন তাঁর ঘরে না আসে।
বন্ধ দরজার আড়ালে শুরু হয় মূর্তি নির্মাণের কাজ। রাজা ও রানি সহ সকলেই নির্মাণকাজের ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ইন্দ্রদ্যুম্নের রানি গুণ্ডিচা রোজই রুদ্ধ দুয়ারে কান পেতে শোনেন কাঠ খোদাইয়ের কাটার ঠক্ ঠক্ শব্দ। চোদ্দদিন পর হঠাৎ রানি দেখলেন রুদ্ধদ্বার কক্ষ নিস্তব্ধ। কী হল !
অত্যুৎসাহী রানি কৌতূহল সংবরণ করতে না পেরে দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করেন। দেখেন মূর্তি তখনও অর্ধসমাপ্ত এবং কাষ্ঠশিল্পী অন্তর্ধিত হয়েছেন। কথিত আছে, এই রহস্যময় কাষ্ঠশিল্পী ছিলেন আসলে দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা।
কিন্তু মূর্তির হাত-পা নির্মিত হয়নি বলে রাজা বিমর্ষ হয়ে পড়েন। কৌতুহলবশত, তারা যে ভুল করে ফেলেছেন, তার জন্য অনুতাপ করতে থাকেন। তৎ মুহূর্তে দেবর্ষি নারদ তার সম্মুখে আবির্ভূত হন। নারদ রাজাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন এই অর্ধসমাপ্ত মূর্তি পরমেশ্বরের এক স্বীকৃত স্বরূপ। একদা দ্বারকায় আগমনকালে নিজ মাতার মুখে নিজেরই বাল্যলীলার কথা শ্রবণে আনন্দবিহ্বল কৃষ্ণ, সুভদ্রা ও বলরামের হস্ত-পদ গলে গিয়েছিল। জগন্নাথ অনন্য, তাঁর হস্ত-পদ নিষ্প্রয়োজন, কারণ যিনি সর্বব্যাপী তার স্থানপরিবর্তন এর কোনরূপ প্রয়োজন হয় না। তিনি যে চিরদ্রষ্টা পরমাত্মা, তাই তাঁর জগদপ্রসারী চক্ষু বর্তমান। জীব তাঁকে যা অর্পণ করে তিনি তাই সহাস্যবদনে দশগুণ ফিরিয়ে দেন।
এরপর জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রা পুরুষোত্তমক্ষেত্র নীলাচলে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নর সম্মুখে দারুব্রহ্মরূপে প্রকটিত হয়েছিলেন। রাজাকে স্বপ্ন দিয়ে জগন্নাথ বললেন যে এমনটা আগে থেকেই পুনর্নির্ধারিত ছিল। তিনি এই রূপেই পূজিত হতে চান। সেই থেকেই জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রার মূর্তি ওভাবেই পূজিত হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে।
পুরীর মন্দিরের বর্তমান স্থান রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন কর্ত্তৃক নির্বাচিত হয়। ১১১৯ খ্রীষ্টাব্দে গঙ্গাবংশের রাজা ভীমদেব কর্তৃক জগন্নাথদেবের মন্দির নির্মিত হয় এবং পুষ্যানক্ষত্রযুক্ত বৈশাখ মাসের শুক্লাষ্টমী তিথিতে বৃহস্পতিবারে দেবতা প্রতিষ্ঠা করা হয়।
জগন্নাথদেবের প্রধান উৎসব হল রথযাত্রা। ‘উৎকলখণ্ড’ এবং ‘দেউল তোলা’ নামক ওড়িশার প্রাচীন পুঁথিতে জগন্নাথদেবের রথযাত্রার ইতিহাস প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে সময় এই রথযাত্রার প্রচলন হয়েছিল সে সময় আজকের ওড়িশার নাম ছিল মালবদেশ। সেই মালবদেশের অবন্তীনগরী রাজ্যে ইন্দ্রদ্যুম্ন নামে সূর্যবংশীয় এক পরম বিষ্ণুভক্ত রাজা ছিলেন, যিনি ভগবান বিষ্ণুর এই জগন্নাথরূপী মূর্তির রথযাত্রা শুরু করার স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন পুরীর এই জগন্নাথ মন্দির নির্মাণ ও রথযাত্রার প্রচলন করেন।
পুরীর জগন্নাথদেবের রথযাত্রা প্রতি বছর আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এরপর আষাঢ় মাসের শুক্লা একাদশীর দিন পূর্ণযাত্রা বা উল্টোরথ অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। যদিও আষাঢ় মাসের পুষ্যানক্ষত্রযুক্ত শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতেই রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হওয়ার নিয়ম। কিন্তু প্রতি বছর তো আর পুষ্যানক্ষত্রের সঙ্গে আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথির যোগ হয় না, তাই কেবল ওই শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতেই রথযাত্রা শুরু হয়ে থাকে। তবে কখনও এই তিথির সঙ্গে পুষ্যানক্ষত্রের যোগ হলে সেটি হয় একটি বিশেষ যোগ-সম্পন্ন রথযাত্রা।
আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে জগন্নাথদেব, বোন সুভদ্রা ও দাদা বলরাম বা বলভদ্রকে নিয়ে রথে চড়ে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের পত্নী গুণ্ডিচার বাড়ি যান। সেখান থেকে সাতদিন পরে আবার নিজের মন্দিরে ফিরে আসেন। এই যাওয়াটাকেই জগন্নাথের মাসির বাড়ি যাওয়া বলে। তবে কালের নিয়মে বদল হয়েছে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার মাসির বাড়ি যাওয়ার পদ্ধতিতে। মন্দির থেকে মাসির বাড়ি যাওয়ার পথে পড়ত গুণ্ডি নালা। তাই সেই সময় একই রথে করে তিনটি বিগ্রহকে নিয়ে মাসির বাড়ি যাওয়া সম্ভব ছিল না। দু’টি ভাগে বিভক্ত ছিল রথযাত্রা। প্রথমে তিনটি রথে করে শোভাযাত্রা করে ত্রিমূর্তি নিয়ে যাওয়া হতো। এরপর তা নামিয়ে নালা পার করে অন্য তিনটি রথে চড়ে মাসির বাড়ি যেতেন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা। এরপর রাজা কেশরী নরসিংহের আমলে এই নালা বন্ধ হওয়ার পর ছ’টি রথের প্রয়োজন ফুরোয়। তিনটি রথেই সম্পন্ন হয় পুরীর রথযাত্রা। রথের দিন তিনটি রথ পর পর যাত্রা করে মাসির বাড়ি। প্রথমে যাবেন বলরামের রথ, তারপর সুভদ্রা এবং সর্বশেষে মহাপ্রভু জগন্নাথের রথ। রথে চড়ে এই গমন ও প্রত্যাগমনকে (সোজা)রথ এবং উল্টোরথ বলে।
জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা তিনজনের রথ তিন রকমের হয়। জগন্নাথের রথের নাম ‘নন্দীঘোষ’। উচ্চতা ৪৫ ফুট। রথের গায়ে হলুদ এবং সোনালি রং। চলার জন্য এই রথে রয়েছে সাত ফুট ব্যাসের ১৬টি চাকা। রথের সারথির নাম দারুক। লাল ও সবুজ রঙের বলরামের রথ ‘তালধ্বজ’। উচ্চতায় জগন্নাথের তুলনায় এক ফুট ছোট। রথে ছ’ফুট ব্যাসের চোদ্দটি চাকা থাকে। সারথি মাতলী। সুভদ্রার রথ ‘দর্পদলন’। উচ্চতা ৪৩ ফুট। রথের রঙ লাল এবং কালো। চাকা বারোটি, প্রত্যেকটির ব্যাস পাঁচ ফুট। এই রথের সারথি স্বয়ং অর্জুন। প্রতিটি রথেই সাতজন করে পার্শ্বদেবী অধিষ্ঠিত। সেই সঙ্গে দু’জন করে দ্বারপাল, একজন করে সারথি এবং একজন করে ধ্বজাদেবতা।
জগন্নাথদেবের রথের প্রতিটি অংশই অতি পবিত্র, কারণ তিনটি রথেই বিরাজ করেন তেত্রিশ কোটি দেবতা। তাই এই রথের রশি একটু স্পর্শ করা বা টানা মানে এই তেত্রিশ কোটি দেবদেবীর চরণ স্পর্শ করা। জগন্নাথদেবের রথের রশির নাম বাসুকি। ধার্মিক সনাতনী হিন্দুরা বিশ্বাস করেন যে, রথের রশি ছোঁয়ার থেকে বড় পুণ্য আর কিছুতে হয় না। জগন্নাথদেবের রথের রশি ধরে টানতে পারলে অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল লাভ হয়। পুুরাণের মতে, জগন্নাথের রথের রশি সামান্য স্পর্শ করলেও পুনর্জন্ম হয় না। কপিল সংহিতায় উল্লেখ আছে - ”গুণ্ডিচাখ্যং মহাযাত্রা যে পশ্যন্তি মুদনিতাঃ/সর্বপাপ বিনির্মুক্তাস্তে যান্তি ভুবনং মম।” অর্থাৎ ‘গুণ্ডিচা যাত্রায় যে ব্যক্তি আমায় দর্শন করবে সে কালক্রমে সব পাপ থেকে মুক্ত হয়ে আমার (জগন্নাথদেবের) ভুবনে যাবে।‘
বাংলাতেও অনেক জায়গায় সাড়ম্বরে রথযাত্রা পালিত হয়। যেমন — মাহেশের রথযাত্রা, ইস্কনের রথযাত্রা। বাংলায় রথযাত্রা সংস্কৃতির সম্ভবত সূচনা হয়েছিল শ্রীচৈতন্যদেবের নীলাচল অর্থাৎ পুরী যাওয়ার পর। চৈতন্যভক্ত বৈষ্ণবরা বাংলায় পুরীর অনুকরণে রথযাত্রার প্রচলন করেন। যাত্রা শব্দের অর্থ গমন। তাই জগন্নাথের রথযাত্রা এবং উল্টোরথ হিন্দু-বাঙালিদের কোনও কাজ বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সূচনার পবিত্রদিন হিসেবে গণ্য করা হয়। বাঙালির অন্যতম শ্রেষ্ঠ উৎসব দূর্গাপূজোর সূচনাও হয় এই রথ কিংবা উল্টোরথের দিন।
শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেবের প্রণাম মন্ত্রঃ —
ॐ নীলাচলনিবাসায় নিত্যায় পরমাত্মনে ।
বলভদ্র সুভদ্রাভ্যাং জগন্নাথায় তে নমঃ ॥
পরমাত্মা স্বরূপ যাঁরা নিত্যকাল নীলাচলে বসবাস করেন, সেই বলভদ্রদেব, সুভদ্রা ও জগন্নাথদেব কে প্রণতি নিবেদন !

Post a Comment