Top News

KRIYA YOGA KRISHNA KATH ( ক্রিয়া যোগে কৃষ্ণ কথা )

 

মন ও মনের শান্তি 










স্বামী নিত্যানন্দ গিরি  (যোগ-বেদান্তাচার্য )

চঞ্চলং হি মনঃ কৃষ্ণ প্রমাথি বলবৎ দৃঢ়ম্।
তস্যাহং নিগ্রহং মন্যে বায়োরিব সুদুষ্করম্।।   (৬/৩৪ শ্লোক) 

আর কেন মন ভ্রমিছ বাহিরে, চলনা আপন অন্তরে। বাহিরে যার তত্ত্ব, কর অবিরত, সেত আজ্ঞাচক্রে বিহরে।

মন যে অতি চঞ্চল, বিষয়ে রত কেবল, কেমনে ধরিবে বল, তারে যোগাভ্যাস বিনে।। 

হে কৃষ্ণ ! মন অত্যন্ত চঞ্চল, বিক্ষোভকারী, দৃঢ় ও শক্তিশালী। তাই একে বশে রাখা আমি বায়ুকে নিরুদ্ধ করার মত দুষ্কর মনে করি।

এই মনের চঞ্চলতা কেবল আমার আপনার নয়। হিন্দু, শিখ, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রীষ্ঠানদের নয়। ভারত, বাংলাদেশ নেপাল, চীন, আমেরিকার নয়, এই চঞ্চলতা মনের রোগ সমস্ত বিশ্বের। 'মানুষ মাত্রই'-এই রোগের শিকার।

এই মনকে স্থির করার জন্য বুদ্ধদেব বোধি বৃক্ষের তলায় বসে মন নিয়ন্ত্রণের অভ্যাস করলেন। লাহিড়ী মহাশয় মনকে নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল শিখালেন। আচার্য্য শংকর মনকে নিয়ন্ত্রণ করে অনন্ত জ্ঞান প্রাপ্ত করলেন। এই মন তো দুর্যোধন, কংস ও রাবণেরও ছিল। তারা কি করেছে? একটু বিচার করলে দেখা যায় যে বুদ্ধ, বিবেকানন্দ, শংকরাচার্য্য, লাহিড়ী মহাশয় তাঁরা তাদের মনকে মিত্র করেছিল, আর কংস,

দুর্যোধন, রাবণ তাঁরা তাদের মনকে দুম্মন অর্থাৎ শত্রু করেছিল। তাই বলা বাহুল্য নয় যে, আমরা আমাদের মনকে মন ও মনের শান্তি

যেন সাধনার উৎস করি। মনকে কখনো বাসনার উৎস না করি। তার জন্য সৎ পুরুষের সঙ্গ করতে হয়। বিশেষ অভ্যাস প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে হয়।

যেমন একটি উদাহরণ দিয়ে স্পষ্ট করা যাক, দুধ আমরা খাই, দুধ থেকে দই, দই থেকে মাখন হয়ে শেষ পর্যন্ত ঘিতে পরিণত হয়। ঘি একবার হয়ে গেলে আর জলীয় পদার্থের সঙ্গে মেশে না। ঠিক তেমনি শিল্পি (সমুদ্রের ছোট শামুক) একবার মোতীতে রূপান্তর হয়ে গেলে আর তার মূল্য অধিক হয়ে যায়। যেমন দুধ ৩০/৩৫ টাকা লিটার হলেও ঘি ৩০০/৩৫০ টাকা কিলো হয়ে যায়। সেরূপ কিছু অভ্যাসের ফলে মানুষের খারাপ বৃত্তি ভাল বৃত্তিতে রূপান্তরিত হয়ে মহাপুরুষ হতে পারে। প্রত্যেক ব্যক্তির মনে কামনা বাসনা হয়। এতে কোন সংশয় নেই। কিছু সময় যদি সংসারে থেকেও সংসারে একটা সময় দিয়ে মনকে সাধনার জন্য কেন্দ্রিভূত করা যায় তাহলেও সেই মন আর সংসারে মিশে যায় না।

সংসারে কোন কিছু করতে গেলে মনের একাগ্রতার প্রয়োজন। সেই অধ্যয়ন থেকে শুরু করে অর্থ উপার্জন পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই মনকে নিয়ন্ত্রণ রাখতে হয়। মনের পাঁচটি অবস্থা, ক্ষিপ্ত, বিক্ষিপ্ত, মূঢ়, একাগ্র ও নিরুদ্ধ অবস্থা। ব্যক্তির গুণ অনুযায়ী মনে তার প্রভাব পড়ে। রজঃ গুণের জন্য ক্ষিপ্ত, বিক্ষিপ্ত হয়। তমঃ গুণের জন্য মূঢ় ভাব বা আলস্য ভাব হয়। আর সত্ত্ব গুণ থাকলে একাগ্র ও নিরুদ্ধ করার প্রয়াস করে। 'আহার শুদ্ধৌ সত্ত্ব শুদ্ধৌ সত্ত্ব শুদ্ধৌ প্রবা স্মৃতি'। আহার শুদ্ধ ও সাত্ত্বিক হলে মনের সাত্ত্বিকতা বৃদ্ধি পাবে। এতে কোন সংশয় নেই। প্রত্যেকের মন অত্যন্ত অশান্ত প্রায়। সাংসারিক লোকের মন অশান্তের কারণ আশা-তৃষ্ণা, শোক-মোহের জন্য। দেবর্ষি নারদের মন অশান্ত হওয়ার জন্য ঋষি সনৎকুমারের কাছে গিয়ে অশান্ত মন শান্ত হওয়ার জন্য উপায় জিজ্ঞাসা করেছিল।

হে মহারাজ, আপনাদের মত মহাপুরুষরা আত্মজ্ঞানী হয়ে শোক এবং মোহের উপরে থেকে বিরাজ করছেন। আমি অত্যন্ত হায়রান হয়ে গেছি অশান্ত হয়েছি এর উপায় কৃপা করে বলুন। 'তরতি শোকম্ আত্মবিত' আত্মাকে জানলে শোক রূপ কষ্টকে অতিক্রম করা যায়। ভেবে দেখুন নারদের মত মুনি নিজের ভুলকে স্বীকার করেছন। অর্জুনও শ্রীকৃষ্ণের সামনে নিজের দৈন্যতা স্বীকার করেছে। আমরা আমাদের ভুল কোথাও স্বীকার করি না।

আপনারা এই গল্প শুনে থাকবেন, নারদজী মহারাজ সমাধি অভ্যাস করার সময় প্রতি মূহুর্ত নারায়ণকে স্মরণ করতে ছিল। নারদ সব সময় নারায়ণ, নারায়ণ স্মরণ করে চলত। একদিন নারদ ভগবানকে জিজ্ঞাসা করল মায়া কি?

কবীর তো লিখেছেন  'ন মায়া মরী না মন মরা..-------

ভগবান নারদজীকে মায়ার স্বরূপ বলেছিলেন, মায়ার স্বরূপ দেখতেই নারদজী মায়ার প্রতি আকর্ষিত হ'ল।

এবং নারদজী যখন মায়াকে পেল না, মায়া না পাওয়ায় অসমর্থ হয়ে ভগবানকে অভিশাপ দিয়ে বসল। বিচার করে দেখুন যাকে প্রতিপল ভজন করত, যাকে সবসময় সেবা করত, রাতদিন যার নাম জপতো তাকেই অভিশাপ দিয়ে বলল যে সে বানর হয়ে যাক। অর্থাৎ আগেই বলেছি মনই পরমাত্মা-নারায়ণ। আর মন চঞ্চল, আর মনের মত বানরও চঞ্চল, তাই বানর অভিশপ্ত।

এটা মনের কথা। মন একটু অনিয়ন্ত্রিত হয়ে গেলেই জীবনে কত রকমের সমস্যা সৃষ্টি হয়ে যায়। অর্জুন কৃষ্ণ ভগবানকে বললেন এই মন আমাকে অস্থির ও অশান্ত করে রেখেছে। উত্তরে ভগবান অর্জুনকে বললেন-“অভ্যাসেন তু কৌন্তেয় বৈরাগ্যেণ তু গৃহ্যতে”। অর্থাৎ মনকে যদি ধরতে হয়, বশ করতে হয় অর্জুন তা হলে তুমি অভ্যাস কর এবং বৈরাগ্যের সাথে করবে।

আমরা রুটি তৈরীর সময় দেখেছি রুটি তো তাবায় হয়। কিন্তু রুটি ধরার জন্য চিষ্টি দরকার হয় পাল্টানোর জন্য। এখানে পরমাত্মা হ'ল রুটি আর চিমটি হল মন। যে ব্যক্তি পরমাত্মাকে ধরতে বা জানতে চায়। মনকে না ধরে পরমাত্মাকে ধরা যায় না, যাবে না। সম্পূর্ণ জীবনেই ধোঁকা খাবে যদি মন এবং মনের অস্তিত্ব না জেনে ঝাঁপ দিতে থাকে। দেখ, পরমাত্মা যদি বাইরের বস্তু হ'ত তাহলে অন্য দ্রব্যের মত খাট, আলমারীর মত ক্রয় করে নিয়ে আসা যেত। পরমাত্মা তো মানুষের ভিতরে আছেন। আর মানুষের মন ভিতরে না থেকে বাইরের বস্তুতে বিচরণ করতে থাকে। বহিঃমুখী মনকে অন্তর্মুখী করলে পরমাত্মা দর্শন হয়। এই জন্য শ্রুতি ভগবতী বললেন- 'মনসৈবানুম্ দ্রষ্টব্যঃ' মনের অন্তমুর্খীতা কি করে হবে। ১) গুরু প্রদর্শিত সাধনা ২) নিত্য অনিত্য বস্তুর বিচার দ্বারা। শরীর শুদ্ধ জড় আর আত্মা শুদ্ধ চেতন।

শরীর ও আত্মার মধ্যে সেতুর কাজ করে মন। মনের সম্বন্ধ শরীরের সাথে আছে আবার মনের সম্বন্ধ আত্মার সঙ্গে আছে। আত্মশক্তি পেয়ে এই মন যখন শরীরকে দেয় তখন শরীরের ভিতর চেতনার অনুভূতি হয়। আর যখন শরীরের ধর্মকে আত্মাতে দেয় তখন আত্মা বলে আমি সুখী, আমি দুঃখী। এখানে বিশেষতা মনের হ'ল সে জড় পদার্থকেও চায় এবং চেতন পদার্থও চায়। মন কখনো পরমাত্মার প্রতি প্রেম করতে লাগে কখনো পদার্থের প্রতি প্রেম সম্বন্ধ জুড়ে। কখনো পরমাত্মা তো কখনো প্রপঞ্চ পদার্থ।

দেখ জগতে প্রত্যেক ব্যক্তির মনে দু-ধরণের স্থিতি হয়ে থাকে। একটির নাম শ্রদ্ধা অন্যটির নাম সংশয়। দুর্যোধনের মনে শ্রদ্ধাও ছিল এবং সংশয়ও ছিল। আর অর্জুনের মনে শ্রদ্ধা ছিল এবং সংশয় ছিল। এবার ব্যক্তি বিশেষে সংস্কারের জন্য শ্রদ্ধা ও সংশয়ের পার্সেন্টেজ কম বেশী হয়ে থাকে। শ্রদ্ধা ও সংশয় সমন্বিত এই মন ও মনুষ্যজীবন।

এই মনই শ্রদ্ধার উৎস এবং মনই সংশয়ের উৎস। শ্রদ্ধা ও সংশয় উভয়ই মানুষকে ঠিক জায়গায় পৌঁছে দেয় আবার সংশয় মানুষকে উচিত বা ঠিক রাস্তা থেকে ভ্রমিত করে দেয়, ভুল জায়গায় পৌঁছায়।

ভুল জায়গায় শ্রদ্ধা করলে ভ্রমিত হতে হবে। দুর্যোধনের শ্রদ্ধা ছিল ঐশ্বর্যের প্রতি আর সংশয় ছিল ঈশ্বরের প্রতি। অর্জুনের শ্রদ্ধা ছিল ভগবানের প্রতি। ভগবানের কাছে দুজনেই গিয়েছিল, অর্জুন বলেছিল 'কিম্ নো রাজ্যেন গোবিন্দ কি ভেগৈজীবিতেন বা'। রাজ্যভাগে কি লাভ যদি গোবিন্দ না পাওয়া যায়। অর্জুনের পরমাত্মার প্রতি শ্রদ্ধা ছিল। যার প্রতি শ্রদ্ধা থাকবে তাকে সে গ্রহণ করবে আর যার প্রতি সংশয় থাকবে সে তাকে ত্যাগ করবে। অর্জুন সৈন্যদের ত্যাগ দিয়ে ভাগবানকে গ্রহণ করেছে। আর দুর্যোধন ভগবানকে ত্যাগ করে নারায়ণী সেনা গ্রহণ করেছ। এই সিদ্ধান্ত নিতে অর্জুন ও দুর্যোধনকে কে প্রেরিত করেছে? দুর্যেধনের মন দুর্যোধনকে আর অর্জুনের মন অর্জুনকে প্রেরণা দিয়েছে।
এখানে বলার উদ্দেশ্য হল, প্রত্যেকের নিকট তাঁর মন তো স্বাভাবিক রূপেই বিদ্যমান আছে। যদি আপনি সৎ শাস্ত্র শ্রবণ করেন বা সৎসঙ্গ করেন আপনার মন আপনাকে বুদ্ধ, বিবেকানন্দ তৈরী করে দেবে। মনে শান্তি আসবে। কিন্তু যদি আপনি কুসঙ্গ করেন তো আপনি নিজেই অশান্তি ও নরক যন্ত্রনা ভোগ করবেন। সেইজন্য ভৌতিক উন্নতিই হোক আর আধ্যাত্মিক উন্নতিই হোক মনের সহযোগিতা খুবই প্রয়োজন। মানুষের মন মানুষকে কখন সহযোগ করে? কখন অসহযোগ করে? আমি আপনি কি চাই না যে মন আমাদের সহযোগ করুক। অবশ্যই চাই, দেখবেন সমস্যাটা কোথায়? যখন আমরা বাইরে যাই তখন মন সহযোগ করে পরন্তু যখন আমরা ভিতরের দিকে যেতে থাকি-তখন মন অসহযোগ করে। অনেকেই আমাকে বলেছে যখনই সাধনায় বসতে চেয়ে সাধনা করতে বসেছে তখন মনে নানা বিচার আসতে থাকে, বা নিদ্রা-তন্দ্রা বেশী আসে। নানা চিন্তায় ভ্রমিত হতে থাকে অথচ জাগ্রত অবস্থায় কোন চিন্তা নেই কারণ সে তো বাইরে আছে। অনেকে বলে আমাকে যে তার ঘুম হচ্ছে না, আসছে না। আমি বলি- “উঠে বসে প্রাণায়াম ধ্যান কর ৫ মিনিট বা ৫ মিনিট মালা নিয়ে গায়ত্রী মন্ত্র জপ কর তখনই তার ঘুম পেয়ে যায়। দেখ কত অসহযোগ করে তোমার সাথে তোমার মন। 

এই মন কখনো রাম বা কৃষ্ণের সামনে দাড় করায়। মীরার মন মীরাকে কৃষ্ণের সামনে নাচাতে ছিল। মীরার মন এতই পবিত্র ছিল। সে কৃষ্ণের রহস্য বুঝেছিল। অন্যদেরও মন আছে কিন্তু কৃষ্ণ রহস্য কেউ বুঝতে পারে না। সংসারের রহস্য বুঝতে বুঝতে তোমার জীবন শেষ হয়ে যায়।

মন-ই পূর্ণ ব্রহ্ম। রামকৃষ্ণ পরম হংস দেবীর সঙ্গে কথা বলতেন। শ্রী শ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয় নিজেকে কৃষ্ণ ও কালী উভয় ভাবে উপলব্ধি করেছেন। আচার্য্য শঙ্কর গুহাতে বসেই ব্রহ্মসূত্রের ভাষ্য রচনা করেছিলেন। মহাপুরুষ তখনই হয় যখন তারা মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়। বিচার করে দেখবে তুমি মনের ছায়া। কি মন তোমার ছায়া।

পূর্বেই বলেছি যে মনকে শৈশব থেকে প্রশিক্ষণ না দিলে পরিণত বয়সে ঐ মন কখনো সংস্কারিত হয় না। অবচেতন মনে যে যে ভাবনা বা ধারণা দেওয়া হয় বড় হয়ে সেগুলিই সে করতে থাকে। প্রত্যেক বাবা মা তাদের ছেলে-মেয়েদের অর্থনৈতিক অর্থাৎ ভৌতিকবাদের দিকটাই তুলে ধরে এবং তাঁর জন্য বেশীরভাগ তাঁদের প্রেরণা দিয়ে উৎসাহিত করে। Money Making education কে প্রাধান্য দেয়। Man making education কে প্রাধান্য দেয় না। আমাদের মনকে মনোবৈজ্ঞানিক তিন ভাবে ভাগ করেছে।

(১) চেতন মন (Concious mind), (২) অচেতন মন (Unconcious mind), (৩) অবচেতন মন (Sub Concious mind)।

আমরা দেখি আমাদের পিতা মাতা বা আমাদের আত্মীয়রা জীবন সম্বন্ধে একটা ধারণা তৈরী করে দেয়। বলা যেতে পারে জীবনের একটা রূপরেখা নির্মাণ করে দেয়।  Read More

Post a Comment

Previous Post Next Post